গনমাধ্যমের ঘটনার উপস্থাপন ও জনমত: ফ্রেমিং তত্ত্ব

আমরা সংবাদপত্র পড়ার সময় একেক ঘটনা একেক পত্রিকায় একেক ভাবে প্রতিফলিত হতে দেখি। যেমন কোন পত্রিকায় শেয়ার বাজারে দরপতনের ঘটনার সংবাদ পড়লে একে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা হিসেবে মনে হবে। আবার আরেকটি পত্রিকার খবর পড়লে মনে হবে, এটি বিনিয়োগকারীদের অস্থির আচরনের কারনে হয়েছে। গনমাধ্যমে একেক ঘটনা একেকভাবে উপস্থাপন করার এই পদ্ধতিকে একাডেমিক পরিভাষায় বলা হয় ফ্রেমিং (Media framing).  এ বিষয়টি নিয়ে আজ কিছু আলোচনা করবো।

গবেষকরা বিভিন্ন সময় জনমতের উপর গনমাধ্যমের ব্যাপক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। জনমনে উপলব্ধ জাতীয় এজেন্ডাগুলো সৃষ্ট হয় গনমাধ্যমের সাহায্যে, যাকে বলা হয় এজেন্ডা-নির্ধারণী তত্ত্ব (Agenda-setting theory)। এ তত্ত্বমতে, মানুষ দৈনিক পত্রিকার শিরোনামগুলো পড়ে ভাবতে থাকে যে, দেশে এই মুহুর্তে প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলো কি কি। ফ্রেমিং তত্ত্বমতে, গনমাধ্যম মূলত এর চেয়েও অনেক শক্তিশালী। এ তত্ত্ব বলে যে, গনমাধ্যম একেকটি বিষয়কে একটি সুনির্দিষ্ট ভঙ্গীতে উপস্থাপন করে, যার ফলে পাঠকের মনে অধিকাংশ সময় ঐ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার সময় গনমাধ্যমের ফ্রেমাবদ্ধ চিত্রটিই নিয়ে ভেসে উঠে। কোন একটি ঘটনা, ইস্যু বা বিষয় বর্ণনা করার সময়, সাংবাদিক ঐ পত্রিকা ও তার নিজের দৃষ্টিকোন থেকে ঘটনাটি ব্যখ্যা করেন। সাংবাদিকটি একটি ঘটনার কোন দিক উহ্য রাখেন, কোন একটি দিক অল্প প্রকাশ করেন, আবার কোন একটা দিক অতিরিক্ত প্রকাশ করেন। এভাবে যেসব ঘটনাগুলো নিয়ে গনমাধ্যমে রিপোর্ট হয়, সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে বা ভঙ্গিতে বা আকারে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ফলে পাঠকও অধিকাংশ সময় ঘটনাটা নিয়ে চিন্তা করার সময় গনমাধ্যমের উপস্থাপনা-মতোই চিন্তা করতে থাকেন।

গবেষকরা ৭০ এর দশকে জনমতের ওপর গনমাধ্যমের গভীর প্রভাবের কথা আলোচনা করে এজেন্ডা-নির্ধারণী তত্ত্বের অবতারনা করেছিলেন। মূলত আশির দশকের শেষের দিকে গনমাধ্যমের এজেন্ডা-নির্ধারন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের পন্ডিতরা এই ফ্রেমিং তত্ত্বের অবতারনা করেন। গনমাধ্যম গবেষকরা প্রথমদিকে গনমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব ও বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে গবেষনা করতেন। পরে গবেষকরা বলতে থাকেন, গনমাধ্যম মূলত বিভিন্ন ইস্যুকে বিভিন্ন ভাবে ফ্রেমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে। সংবাদ ফ্রেম এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন,

News frame is ……a  central organizing idea for news content that supplies a context and suggests what the issue is through the use of selection, emphasis, exclusion and elaboration.

সংবাদপত্র কিভাবে বিভিন্ন ঘটনাকে নির্দিষ্ট ফ্রেমে করে উপস্থাপন করে, তা কয়েকটি উদাহরন দিলে পরিষ্কার হবে। আমাদের দেশে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি সংবাদপত্রে একটা বহুল আলোচিত বিষয়। সংবাদপত্রে এটা নিয়ে নানান ভাবে প্রতিবেদন হয়েছে। যেমন একটা দিক হলো, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময়কার দামের সাথে তুলনা করা। অর্থাৎ ৯৬ এর আওয়ামী লীগ সরকার, ২০০১ এর বিএনপি সরকার ও ২০০৯ এর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার দামের সাথে তুলনা করা। এক্ষেত্রে মূলত তুলে ধরা হয় যে, দ্রব্যমূল্যের দাম কোন সরকার কত কম রাখতে পেরেছে। সংবাদপত্রে যে সরকার ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে’ রাখতে পেরেছে তাকে বেশী সফল বলে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে শুধু সরকারের কাজ দায়ী না, দ্রব্যের আন্তর্জাতিক দাম, কৃষিপণ্যের দাম, শ্রমিকের মজুরি, যাতায়াত খরচ, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা প্রভৃতি অনেক ফ্যাক্টরও দায়ী। কিন্তু সংবাদপত্রে সরকারের ভূমিকাকে মূখ্য করে দেখানোর ফলে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি হলেই জনরোষ বেড়ে যায়, কারন জনগন তাকে সরকারের ব্যর্থতা বলেই গন্য করে।

আমাদের সংবাদপত্রে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো সীমান্তে অব্যাহত ভাবে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রে এঘটনায় বিএসএফকে একটা বহিরাগত হানাদার বাহিনী হিসেবে দেখানো হয়, যারা বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে গুলি করে মারে। যেমন দেখা যায়, শিরোনামগুলো হয় এরকম, ‘বিএসএফ এর গুলিতে আরো দুই জন নিহত’,  ‘কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ফুলবাড়ী সীমান্তে উত্তেজনা’, ‘সাতক্ষীরা সীমান্তে বিএসএফের গুলিবর্ষণ’ এরকম।উল্লেখ্য যে সীমান্তে গন্ডগোলের পেছনে আরো অনেক কারন আছে। যেমন, অব্যাহত চোরাচালান, সীমান্তের দুপাশের মানুষের মধ্যে অব্যাহত যোগাযোগ, ভারত সরকারের বৈদেশিক নীতি এসব। কিন্তু এসব বিষয় উপেক্ষা করে শুধুমাত্র বিএসএফ কে আক্রমনকারী হিসেবে দেখানো হয়।

আবার দেখা যায় যে, ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার ইস্যু নিয়ে পত্রিকাগুলোর কাভারেজের ফ্রেমগুলো বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, ভারত কর্তৃপক্ষকে একরকম মেহমান ও আওয়ামী লীগ সরকারকে তাদের খাদেম হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ‘ভারতকে ট্রানজিট দেওয়া হচ্ছে’, বর্ণনার ষ্টাইলটা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যেন তাদের বাসার এতদিনকার বন্ধ দরজা খুলে ভারতকে ঘরে আসতে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ দরজা খুলে অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়ায় ভারত এখন অবাধে আমাদের ঘরে ঢুকতে, বের হতে পারবে।

আমি, ট্রানজিট দেওয়া যুক্তিযুক্ত কিনা, সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু সংবাদপত্র সম্পর্কে ধারনার জন্য ঘটনাটি সংবাদপত্রে কিভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তা কি ভালো না খারাপ, সে প্রশ্ন হচ্ছে ট্রানজিট দেওয়া নিয়ে আমাদের মনোভাবের উপর, যা এই লেখার সিলেবাসবহির্ভূত।

ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়টি অনেক জটিল এবং এতে বহু পক্ষ জড়িত। কিন্তু বিষয়টিকে শুধু মাত্র এই ‘আওয়ামী লীগ দরজা খুলে ভারতে আসতে দিচ্ছে’ এভাবে উপস্থাপন করায়, পাঠকও বিষয়টাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করছেন। যারা ভারতবিরোধী, তারা এই উদ্যোগের বিরোধীতা করছেন, আবার যারা ভারতের সাথে খাতির করার পক্ষে, তারা সমর্থন করছেন। কিন্তু এই উদ্যোগের সাথে দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বানিজ্য, শুল্ক, আইনশৃঙ্খলা প্রভৃতি অনেক বিষয় জড়িত থাকলেও গনমাধ্যমে এই দিকগুলো পর্যাপ্তভাবে না আসায় এ নিয়ে জনমতে তেমন কোন বিতর্কও হচ্ছে না।

গনমাধ্যম পন্ডিতরা বলেছেন, ফ্রেমিং এর প্রভাব অত্যন্ত সুক্ষ, কিন্তু শক্তিশালী। জনগন সাধারণত পক্ষপাতদুষ্ট গনমাধ্যম দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয় না। সোজা ভাষায় বললে, আমাদের দেশে এমন ব্যক্তি খুব কমই আছে, যারা দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক জনকন্ঠের প্রতিবেদনগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করেন। কারন সবাই জানি, যে ঐ দুটি দৈনিক ব্যাপকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। কিন্তু ফ্রেমিং এর মাধ্যমে একটি ঘটনাকে কয়েক পক্ষের কাজের সমষ্টি হিসেবে একটি মোড়কে উপস্থাপন করা হয়, ফলে পাঠক এর পক্ষপাতদুষ্টতা বা বস্তুনিষ্ঠতার অভাব বুঝতে পারেন না। গনমাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুগুলো যে আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়, আমাদের মতো আম’জনতার জন্য তার বাইরের কোন দৃষ্টিকোন দিয়ে চিন্তা করা বেশ কঠিন।

আরো একটি উদাহরন দিয়ে বিষয়টি খোলাসা করতে চাই। ধরা যাক, তরুন সমাজের মধ্যে মাদকে ব্যবহারের বিষয়টি। এ বিষয়টিকে একজন সাংবাদিক দুইভাবে উপস্থাপন করতে পারেন: ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক। ব্যক্তিগত ভাবে উপস্থাপন করে রিপোর্ট হতে পারে এভাবে যে, তরুন সমাজের মধ্যে একটি অংশ মাদকদ্রব্য গ্রহনে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান-বনানী-উত্তরা এলাকার ধনী পরিবারের সন্তানরা এতে বেশী আসক্ত হচ্ছে। তারা অসৎজনের পাল্লায় পড়ে বেপথু হচ্ছে।

এভাবে কোন রিপোর্ট লেখা হলে, তা পড়লে পাঠক ভাববেন, এসব হচ্ছে ব্যক্তিগত অপরাধ, এতে জাতীয়ভাবে সরকারের বেশী মাথাব্যাথা করার কারন নেই। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে বখে যেতে চায়, তো তার জন্য সরকারের সব কাজ ফেলে এসব নিয়ে ব্যস্ত হবার কারন নেই, দেশে আরো বহু সমস্যা আছে। সেজন্য তিনি ও তার মতো আরো অনেকে হয়তো এটাকে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করবেন না।

আবার ধরা যাক, রিপোর্টটি হতে পারে এভাবে, দেশে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ভারত থেকে চোরাই পথে ঢলে ঢলে মাদকদ্রব্য আসছে। একটি বিশেষ ক্ষমতাবান গোষ্ঠী এর সাথে জড়িত, তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তারা এত শক্তিশালী যে, সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

পাঠক, লক্ষ্য করুন, এভাবে একটি প্রতিবেদন লেখা হলে তা আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষমতার দৌড় নিয়েই প্রশ্ন তোলে। অধিকাংশ পাঠক এটা পড়ে বেশ পেরেশান হবেন, ভাববেন, কারা এত ক্ষমতাবান, যারা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী? দেশের স্বার্থে এ ব্যাপারে আশু পদ্ক্ষেপ দরকার। এধরনের রিপোর্ট লেখা হলে দ্রুত সরকারী একশনের পক্ষে জনমত গড়ে উঠবে।

কাজেই দেখা গেলো, কোন ফ্রেমে একটি ঘটনা উপস্থাপিত হবে, তা জনমতের উপর বেশ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, গনমাধ্যম একটি ইস্যুকে সবসময় একই ভাবে উপস্থাপন করে না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর উপস্থাপনার ফ্রেম পরিবর্তিতও হয়। যেমন ধরা যাক, সাম্প্রতিক কালের ইভটিজিং সংক্রান্ত ঘটনাগুলো। কোন ইভটিজিং এর ঘটনা ঘটার পর প্রথমে সংবাদপত্রে ঘটনাটি একটা আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে আসে। এটাকে সেই অঞ্চলের সামাজিক সমস্যা বলে দেখা হয়। তারপর ফলোআপ প্রতিবেদনগুলোতে এটাকে একটা জাতীয় বা সামষ্টিগত সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়, এবং জাতীয় ভাবে নারীর প্রতি হয়রানী বা নিপীড়ন কতটুকু তা তুলে ধরা হয়। এভাবে কোন কোন আঞ্চলিক সমস্যা সংবাদপত্রে জাতীয় ও বৃহত্তর সমস্যা হিসেবে ফুটে ওঠে, কোনটা আবার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘটনা হিসেবে রয়ে যায়।

 

 

Advertisement

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Connecting to %s